জাপানে নজরুল চর্চা
জাপানে নজরুল চর্চা এখন শুরু হয়েছে বা এখনও শুরু হয় নি বললেও চলে। নজরুল চর্চা সম্পর্কে কিছু কথা বলার আগে জাপানে বাংলা সাহিত্য চর্চা নিয়ে কিছু বলা যাক ।
জাপানে এখনও সাধারণ লোকের মধ্যে শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথকেই জানা আছে। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরেই জাপানে তাঁর পরিচয় শুরু হয়। গত ১০০ বছর ধরে জাপান সবসময় পশ্চিমমুখী ছিল বলতেই হয়। রবীন্দ্রনাথের পরিচয় উনিশশো দশক থেকে শুরু হয়েছে তার কারণ তিনি পশ্চিম দেশে শ্রেষ্ঠ কবি রূপে সমাদৃত। তখন জাপানে এমন কেউ ছিল না বাংলা ভাষা বুঝতে পারে আর অনুবাদ করতে পারে। প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথের সব রচনার অনুবাদ করা হয়েছিল ইংরেজী থেকে। এখন সেই প্রথম পরিচয়ের আশি বছরের পরে জাপানে রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী বেরিয়েছে আর তার বেশির ভাগ বাংলা ভাষা থেকে সরাসরি অনুবাদ করা হয়েছে। কিন্তু জাপানে রবীন্দ্র চর্চা বা গবেষণা চলছে কিনা বলা মুশকিল। আমাদের দেশে বাংলা সাহিত্যের গবেষক খুব কম, আর শুধুমাত্র ভাষার দিক থেকেও আরও অনেক কিছু করার আছে।
রবীন্দ্রনাথ ছাড়া জাপানে বাংলা সাহিত্যের পরিচয় শুধুমাত্র চার-পাঁচ বছরের আগে থেকে শুরু হয়েছে। সব চেয়ে প্রথমে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীর অনুবাদ করা হয়। তারপর মহাশ্বেতা দেবীর গল্পগুচ্ছ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পগুচ্ছ আর জীবনানন্দ দাশের “রূপসী বাংলা”-র অনুবাদ বেরিয়েছে। এগুলো সব বাংলা ভাষা থেকে অনুবাদ করা হয়েছে আর অনুবাদের ভাষা বা মান মোটামুটি ভাল বলা যায় ।
অবশেষে নজরুল। নজরুলের অনুবাদ আমি নিজেই করেছি আর দু’এক মাসের মধ্যেই বইটা প্রকাশিত হবে। অনুবাদ করতে করতে আমি নানা জায়গায় নজরুলের পরিচয় দিতে চেষ্টা করেছি। কারণ জাপানে সাধারণ পাঠক বা সম্পাদকেরা নজরুলের নামও আগে শোনেনি আর গবেষকদের মধ্যেই মাত্র নজরুলের নাম জানা ছিল।
আমি আগে বলেছি যে অনেক দিন ধরে জাপানে বাংলা সাহিত্যের মান রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ছিল। জাপানের পাঠকেরা রবীন্দ্রনাথের কাব্যরূপে অভ্যস্ত। তাদের ধারণায় রবীন্দ্রনাথের বা বাংলা কাব্য নিবেদিতচিত্ত এবং পেলব। তাই তারা নজরুলের রচনায় একদম আলাদা সুর দেখে আশ্চর্য হয়েছেন।
অন্যদিকে ভারতের নানা বিষয়ের গবেষকেরাও নজরুলের জীবন-কাহিনী অথবা নজরুল রচনার ঐতিহাসিক ভূমিকায় বেশ কৌতূহল দেখিয়েছেন। যেমন ধরুন, “আমার কৈফিয়ৎ” পড়লে তখনকার নজরুলের সাহিত্যিক জীবন বা তিনি সাহিত্যিক সমাজে কি ধরনের সমস্যায় পড়েছিলেন, তা বোঝা যায়। অথবা “সাম্যবাদী” কাব্য সংগ্রহ বা “লাঙল” পত্রিকা দিয়ে নজরুলের রাজনীতিক ধারণাও জানতেআলোর উদ্দাম পথিক পাবে। “বিদ্রোহী”ও বেশির ভাগই রাজনীতিক দিক দিয়ে পড়া হয়। তার ফলে “বিদ্রোহী” কবিতাকে ইংরেজ শাসনের বিরোধী কবিতা হিসেবে উচ্চস্থান দেওয়া হয়েছে এবং প্রশংসিত হয়েছে।
কিন্তু আপনারা সবাই ভালভাবে জানেন যে বিদ্রোহী কবিতার মূল্য শুধুমাত্র সেই কারণে আছে, তা নয়। “বিদ্রোহী”র ঐতিহাসিক মূল্য আছে বটেই, কিন্তু বিদ্রোহী কবিতার আবেগ এখনও জীবিত। “বিদ্রোহী”তে নজরুল শুধু সেই সময়ের এক ব্যক্তিত্ব চিন্তা ধারণা প্রকাশ করেননি, “বিদ্রোহী”তে তিনি সব যুগের—অতীতের বা ভবিষ্যতের সব মানুষের গৌরব বা মহিমার কথা ঘোষণা করেন। তাই এই বিখ্যাত কবিতা এখনও শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী। নানা ঐতিহাসিক ঘটনা বা ভূমিকা না জানলেও আমাদের পাঠকেরা নজরুলের এই আবেগ বুঝতে পারবে। নানা জায়গায় বার বার “বিদ্রোহী” র জাপানী অনুবাদ আবৃত্তি করতে করতে আমি বিশ্বাস করে ফেলেছি যে নজরুলের সৃষ্টির দেশের সীমা, ভাষার সীমা অথবা সময়ের সীমাও পার হওয়ার শক্তি রয়েছে। আর সেই শক্তি একজন কবি একজন ব্যাক্তি নজরুলেরই ।
আরও দৃষ্টান্ত দিই। “বিদ্রোহী”, “সাম্যবাদী”, “বারাঙ্গনা”র মতন কবিতাকে নানা দেব দেবী, পৌরাণিক কহিনী থেকে উদ্ধৃত করা, চরিত্র পাওয়া যায়। অবশ্যই এমন হিন্দু দেবদেবীর নাম নজরুল ব্যক্ত করায় তখন অনেক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments